দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
দক্ষিণের খবর ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৫ পিএম
আপডেট: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৭ পিএম
পদ্মার চরবেষ্টিত মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়ন। নদীঘেরা এই জনপদের মানুষের অন্যতম প্রধান জীবিকা মাছ শিকার। বছরের অধিকাংশ সময় পদ্মায় মাছ ধরে সংসার চালান স্থানীয় জেলেরা। কিন্তু মাছের সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে এসব পরিবারের আয়-রোজগারও থেমে যায়। তখন সরকারি জেলে সহায়তা হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র ভরসা।
তবে সেই সরকারি সহায়তার তালিকায় প্রকৃত জেলেদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত রয়েছেন এমন অভিযোগ উঠেছে চরজানাজাত ইউনিয়নে। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, পেশায় জেলে নন এমন অনেক ব্যক্তি জেলে কার্ড পেয়েছেন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে পদ্মায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক প্রকৃত জেলের নামই নেই সরকারি তালিকায়।
এ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে স্থানীয় জেলেদের মধ্যে। তাদের দাবি, জেলে কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে প্রকৃত জেলেদের সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়নি। কারও কারও ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েও কার্ড মেলেনি। আবার প্রকৃত জেলে না হয়েও কেউ কেউ কীভাবে তালিকায় স্থান পেয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলে কার্ড পেতে গিয়ে অনেককেই নানা ধরনের বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে।এক জেলে জানান, প্রায় ১৮ বছর ধরে পদ্মায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। নদীতে মাছ ধরাই তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। বছরের পর বছর এই পেশায় থাকলেও এখনো জেলে কার্ড পাননি তিনি। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় কিংবা নদীতে মাছের সংকট দেখা দিলে সরকারি সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হতে হয় তাকে।তার প্রশ্ন, যারা বছরের পর বছর নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাচ্ছেন, তাদের নাম যদি তালিকায় না থাকে, তাহলে জেলে কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা আসলে কী?
চরজানাজাতের জেলে রাকিবের অভিযোগও প্রায় একই। তার বাবা ছিলেন পেশাদার জেলে। বাবার জীবদ্দশায় তিনি কখনো জেলে কার্ড পাননি। বাবার মৃত্যুর পর একই পেশা ধরে রেখেছেন রাকিবও। পদ্মায় মাছ শিকার করেই চলে তার সংসার। কিন্তু তিনিও এখন পর্যন্ত জেলে কার্ডের সুবিধা পাননি।
রাকিব বলেন, বাবার সময় থেকে তারা জেলে হিসেবে পরিচিত। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে একই পেশায় আছেন। তারপরও কেন তাদের পরিবার সরকারি জেলে সহায়তার তালিকায় নেই, তা তার বোধগম্য নয়।
ভুক্তভোগী রহিম মাদবরের অভিযোগ, জেলে কার্ড পাওয়ার আশায় স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে কয়েক দফা নাগরিক সনদ ও ছবি জমা দিয়েছেন তিনি। একবার নয়, চার-পাঁচবার কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তার হাতে কার্ড আসেনি।
রহিম মাদবর বলেন,প্রতিবারই কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। আমি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কার্ড পাইনি। এখন আর সরকারি সুবিধা পাওয়ার আশাও করি না।তার মতো আরও অনেক প্রকৃত জেলে তালিকার বাইরে রয়েছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
জেলে কার্ড বিতরণ নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে। তার ভাষ্য, তিনি আগে নিয়মিত জেলে কার্ডের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা পেতেন। কিন্তু গত দুই বছর ধরে হঠাৎ তার সরকারি সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়।এর কারণ জানতে সরকারি নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, রেকর্ডে তাকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে।
ওই জেলে বলেন, তিনি জীবিত এবং নিয়মিত মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অথচ সরকারি নথিতে তাকে মৃত দেখানোর ঘটনায় তিনি বিস্মিত। কীভাবে এমন ভুল হলো এবং কার মাধ্যমে তার তথ্য পরিবর্তন হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
স্থানীয় জেলেদের প্রশ্ন, সরকারি তালিকা তৈরির সময় যদি প্রকৃতভাবে যাচাই-বাছাই করা হতো, তাহলে জীবিত একজন মানুষকে কীভাবে মৃত হিসেবে নথিভুক্ত করা হলো?
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, জেলে কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়,মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার সময়ে এটি তাদের পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে তালিকায় প্রকৃত জেলেদের নাম না থাকা মানে শুধু একটি কার্ড থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়, বরং দুর্দিনে সরকারি সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হওয়া।
তাদের দাবি, চরজানাজাত ইউনিয়নে জেলে কার্ডের তালিকা নতুন করে যাচাই করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে যারা নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের সঠিকভাবে শনাক্ত করে তালিকাভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে জেলে পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদের কার্ড বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ছাড়া সরকারি নথিতে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানোর অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত চান স্থানীয়রা। কারও গাফিলতি বা অনিয়মের কারণে যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি তাদের।
চরজানাজাত ইউনিয়নের বিশিষ্ট সমাজ সেবক এডভোকেট নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন' বছরের পর বছর পদ্মায় মাছ শিকার করে যারা পরিবার চালান, সরকারি সহায়তার প্রকৃত দাবিদার তারাই। তাই আমাদের দাবি হলো জেলে কার্ডের তালিকা পুনঃযাচাই করে অনিয়ম দূর করে, অযোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত প্রকৃত জেলেদের দ্রুত সরকারি সহায়তার আওতায় নেওয়া দাবি জানাই।
অভিযোগের বিষয়ে শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, প্রকৃত জেলে নন এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে যাদের জেলে কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা নেই, তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, প্রকৃত জেলেরা যাতে সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে তালিকার বাইরে থাকা প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করে তাদের তালিকাভুক্ত করার বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচএম ইবনে মিজান বলেন, প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং যারা জেলে নন, তারা জেলে কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন এমন অভিযোগ তার কাছেও এসেছে।তিনি বলেন, এ বিষয়ে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চরজানাজাতের জেলেদের অভিযোগের সত্যতা তদন্তে কী উঠে আসে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু কাগজপত্রের ভিত্তিতে নয়, মাঠপর্যায়ে সরেজমিন যাচাই করে প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করা হবে।তাদের বিশ্বাস প্রশাসনের চলমান তদন্তে জেলে কার্ড বিতরণে অনিয়মের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে এবং যোগ্য ব্যক্তিরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবেন এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় জেলেদের।
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team